হরমোন: শরীরের অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল!

Rupan Baidya 🕒 10 Feb 2026, 07:46 AM | 👁️ 6 বার দেখা হয়েছে

হরমোন: জানুন কীভাবে এই রাসায়নিক দূত আপনার প্রতিটি মুহূর্ত, আবেগ এবং স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ করে
​ভূমিকা


​সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত—আপনার ক্ষুধা, মেজাজ (Mood), শক্তি, দুশ্চিন্তা, ভালোবাসা, এমনকি আপনার ওজন বাড়া বা কমা—সবকিছুর পেছনেই কলকাঠি নাড়ছে এক অদৃশ্য শক্তি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে হরমোন (Hormone)।


​আমাদের শরীরকে যদি একটি বিশাল এবং জটিল ফ্যাক্টরি হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে হরমোনগুলো হলো সেই ফ্যাক্টরির 'ম্যানেজার' বা 'কেমিক্যাল মেসেঞ্জার'। এরা রক্তস্রোতের মাধ্যমে শরীরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বার্তা নিয়ে যায় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নির্দেশ দেয়—কখন কী করতে হবে। সামান্য একটু হরমোনের এদিক-সেদিক আপনার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, আবার সঠিক ভারসাম্য আপনাকে দিতে পারে সুস্থ ও সুন্দর জীবন।


​আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা জানব হরমোন কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং প্রধান প্রধান হরমোনগুলো কীভাবে আমাদের জীবনধারা (Lifestyle) নিয়ন্ত্রণ করে।


​পর্ব ১: হরমোন আসলে কীভাবে কাজ করে? (Mechanism of Action)


​হরমোন মূলত আমাদের শরীরের এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ড (Endocrine Glands) বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হয়। পিটুইটারি, থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল, প্যানক্রিয়াস, ওভারি (নারীদের) এবং টেস্টিস (পুরুষদের)—এগুলো হলো প্রধান গ্রন্থি।
​হরমোনের কাজের পদ্ধতিকে বিজ্ঞানে 'তালা ও চাবি' (Lock and Key) পদ্ধতির সাথে তুলনা করা হয়:
১. নিঃসরণ: মস্তিষ্কের নির্দেশে গ্রন্থি থেকে হরমোন রক্তে মিশে যায়।
২. ভ্রমণ: রক্তের মাধ্যমে এটি পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. রিসিভিং: শরীরের নির্দিষ্ট কিছু কোষের গায়ে বিশেষ 'রিসিভার' বা তালা থাকে। নির্দিষ্ট হরমোনটি (চাবি) যখন সেই নির্দিষ্ট রিসিভারে (তালা) যুক্ত হয়, তখনই সেই কোষটি কাজ শুরু করে।
​উদাহরণস্বরূপ, ইনসুলিন হরমোন যখন কোষের দরজায় টোকা দেয়, তখনই কোষ দরজা খুলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ বা শর্করা গ্রহণ করে।


​পর্ব ২: আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান হরমোনসমূহ


​মানবদেহে প্রায় ৫০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন হরমোন রয়েছে। তবে আমাদের প্রতিদিনের জীবনধারা বা লাইফস্টাইলকে সরাসরি প্রভাবিত করে এমন প্রধান কয়েকটি হরমোন সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো:


​১. কর্টিসল (Cortisol) – স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তার হরমোন


​এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়। বিবর্তনের ধারায় এটি আমাদের বিপদের সময় সতর্ক করার জন্য তৈরি হয়েছিল।
​কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে: আপনি যখন খুব চাপে থাকেন বা ভয় পান, কর্টিসল বেড়ে যায়। এটি রক্তচাপ বাড়ায় এবং শরীরকে 'ফাইট অর ফ্লাইট' (লড়ো অথবা পালাও) মোডে নিয়ে যায়।
​নেতিবাচক প্রভাব: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে থাকলে কর্টিসল সবসময় বেশি থাকে। এর ফলে পেটের চর্বি বাড়ে, ঘুমের সমস্যা হয়, হার্টের রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়।


​২. মেলাটোনিন (Melatonin) – ঘুমের হরমোন


​এটি মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসৃত হয়।
​কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে: এটি আমাদের শরীরের ঘড়ি বা 'সার্কাডিয়ান রিদম' ঠিক রাখে। সন্ধ্যা নামলে এবং অন্ধকার হলে শরীর মেলাটোনিন তৈরি করে, যা আমাদের ঘুম পাড়ায়।
​নেতিবাচক প্রভাব: রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো (Blue Light) মেলাটোনিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।


​৩. ইনসুলিন (Insulin) – মেটাবলিজম ও সুগার কন্ট্রোলার


​এটি প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় থেকে আসে।
​কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে: আমরা যখন খাবার খাই, রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে। ইনসুলিন সেই গ্লুকোজকে কোষে পৌঁছে দিয়ে শক্তি উৎপাদন করে।
​নেতিবাচক প্রভাব: অতিরিক্ত শর্করা বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে ইনসুলিন সবসময় বেশি থাকে। একসময় কোষ আর ইনসুলিনের ডাকে সাড়া দেয় না (Insulin Resistance)। এরই চূড়ান্ত রূপ হলো টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা।


​৪. থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) – ইঞ্জিনের গতি নিয়ন্ত্রক


​গলার সামনে অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে এটি আসে।
​কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে: এটি শরীরের মেটাবলিজম রেট ঠিক করে। অর্থাৎ আপনার শরীর কত দ্রুত ক্যালরি পোড়াবে।
​নেতিবাচক প্রভাব:
​হাইপোথাইরয়েডিজম: হরমোন কম থাকলে ওজন বাড়ে, ক্লান্তি লাগে, চুল পড়ে এবং বিষণ্ণতা তৈরি হয়।
​হাইপারথাইরয়েডিজম: হরমোন বেশি থাকলে বুক ধড়ফড় করে, ওজন অস্বাভাবিক কমে যায় এবং ঘাম হয়।


​৫. ডোপামিন, সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন ও এন্ডরফিন – হ্যাপিনেস হরমোন


​এরা মূলত নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবেও কাজ করে। আমাদের মনের অবস্থা এদের ওপর নির্ভরশীল।


​ডোপামিন (Dopamine): একে বলা হয় 'রিওয়ার্ড কেমিক্যাল'। আপনি যখন কোনো লক্ষ্য পূরণ করেন, গেম জিতেন বা পছন্দের খাবার খান, তখন এটি ক্ষরিত হয়। এটি আমাদের মোটিভেশন দেয়।


​সেরোটোনিন (Serotonin): এটি আমাদের মেজাজ ঠান্ডা রাখে এবং ডিপ্রেশন কমায়। রোদে থাকলে এবং ব্যায়াম করলে এটি বাড়ে।


​অক্সিটোসিন (Oxytocin): একে বলা হয় 'লাভ হরমোন'। প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরলে বা বিশ্বাস স্থাপন করলে এটি বাড়ে। এটি সম্পর্ক সুন্দর রাখে।


​এন্ডরফিন (Endorphins): এটি প্রাকৃতিক পেইনকিলার। ব্যায়াম করার পর শরীর যে ফুরফুরে লাগে, তা এর কারণেই হয়।


​৬. ঘেরলিন ও লেপটিন (Ghrelin & Leptin) – ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী


​ঘেরলিন: একে বলা হয় 'ক্ষুধার হরমোন'। পেট খালি হলে এটি মস্তিষ্ককে সিগন্যাল দেয়—"খেতে হবে"।
​লেপটিন: একে বলা হয় 'তৃপ্তির হরমোন'। খাওয়া শেষ হলে এটি মস্তিষ্ককে বলে—"আর দরকার নেই, পেট ভরেছে"।
​সমস্যা: যারা কম ঘুমান বা জাঙ্ক ফুড বেশি খান, তাদের লেপটিন কাজ করে না। ফলে পেট ভরা থাকলেও তারা খেতেই থাকেন, যা ওবেসিটি বা স্থূলতার প্রধান কারণ।


​৭. ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরন – প্রজনন হরমোন


​টেস্টোস্টেরন (পুরুষ প্রধান): পেশী গঠন, গলার স্বর, হাড়ের ঘনত্ব এবং কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
​ইস্ট্রোজেন (নারী প্রধান): মাসিক চক্র, প্রজনন ক্ষমতা এবং হাড়ের সুরক্ষা দেয়।
​ভারসাম্যহীনতা: এই হরমোনগুলোর অসামঞ্জস্য মেজাজ খিটখিটে করা (Mood Swing), ব্রণ (Acne), পিসিওএস (PCOS) এবং প্রজনন অক্ষমতার কারণ হতে পারে।


​পর্ব  ৩: আধুনিক জীবনধারা কীভাবে হরমোনের বারোটা বাজাচ্ছে?


​আমাদের আধুনিক জীবনের কিছু অভ্যাস সরাসরি এই হরমোনগুলোকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে:
​১. প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Food): অতিরিক্ত চিনি এবং ফাস্টফুড ইনসুলিন ও লেপটিনের কাজ নষ্ট করে দিচ্ছে।
২. ক্রনিক স্ট্রেস: সারাদিন কাজের চাপ ও দুশ্চিন্তা কর্টিসল বাড়িয়ে রাখছে, যা বাকি সব হরমোনকে দমিয়ে দেয়।
৩. ঘুমের অভাব: রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজিং মেলাটোনিন কমিয়ে দেয় এবং ক্ষুধা বাড়ানোর হরমোন ঘেরলিন বাড়িয়ে দেয়। ফলে রাতে ক্ষুধা পায় এবং ওজন বাড়ে।


৪. প্লাস্টিকের ব্যবহার: প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্রে থাকা 'জেনোস্ট্রোজেন' (Xenoestrogens) শরীরে ঢুকে প্রাকৃতিক হরমোনের নকল করে এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।

 


​পর্ব ৪: হরমোন ব্যালেন্স করার সহজ উপায় (Natural Solutions)
​সুসংবাদ হলো, ছোটখাটো কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা হরমোনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি:
​প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: প্রতি বেলার খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন। এটি ঘেরলিন কমায় এবং মেটাবলিজম বাড়ায়।
​নিয়মিত ব্যায়াম: ভারী ব্যায়াম বা হাঁটাচলা টেস্টোস্টেরন, এন্ডরফিন এবং গ্রোথ হরমোন বাড়াতে সাহায্য করে।
​পর্যাপ্ত ঘুম: দিনে ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম হরমোন রিসেট করার জন্য অপরিহার্য।
​রোদ পোহানো: ভিটামিন-ডি (যা আসলে একটি হরমোন) তৈরির জন্য গায়ে রোদ লাগানো জরুরি।
​মানসিক প্রশান্তি: মেডিটেশন, দীর্ঘ শ্বাস নেওয়া বা প্রিয় শখের কাজ কর্টিসল লেভেল কম রাখে।

 


​উপসংহার
​হরমোন শুধু শরীরের রসায়ন নয়, এটি আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি। আমাদের রাগ, অভিমান, ক্ষুধা, ঘুম এবং সুখ—সবই এই ক্ষুদ্র রাসায়নিক দূতগুলোর ওপর নির্ভরশীল। শরীর যখন কথা বলে (ক্লান্তি, অনিদ্রা বা ওজন বৃদ্ধির মাধ্যমে), তখন তা উপেক্ষা করবেন না। হতে পারে আপনার হরমোন আপনাকে কোনো সংকেত দিচ্ছে।
​সুস্থ জীবনধারাই পারে হরমোনের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে। তাই আজ থেকেই নিজের শরীরের এই অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোলটির যত্ন নেওয়া শুরু করুন।