**ভারতে নাগরিক সচেতনতার অভাব: সমস্যা, তুলনা এবং ভালো উদাহরণ হিসেবে কিছু রাজ্যের সাফল্য**
দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারতে নাগরিক সচেতনতা বা *সিভিক সেন্স* নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। রাস্তা নোংরা করা, ট্রাফিক নিয়ম না মানা, পাবলিক সম্পত্তির অপব্যবহার—এই সব সমস্যাই দেশের বহু শহরের দৈনন্দিন বাস্তবতা। তবে একই সঙ্গে দেশের মধ্যেই এমন কিছু রাজ্য রয়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে উন্নত নাগরিক আচরণ ও পরিচ্ছন্নতা নজির তৈরি করেছে।
**ভারতের শহরগুলিতে নাগরিক সচেতনতার সংকট**
দেশের বিভিন্ন শহরে দেখা যাচ্ছে—
* রাস্তায় আবর্জনা ফেলা
* প্রকাশ্যে থুতু ফেলা বা প্লাস্টিক ব্যবহার
* ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করা
* পাবলিক স্থানের সঠিক ব্যবহার না করা
* লাইনে দাঁড়ানোর সংস্কৃতির অভাব
স্বচ্ছ ভারত অভিযানের পর সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনও বড় পরিবর্তন সব জায়গায় দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং পাবলিক স্পেসকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে না দেখা এই সমস্যার মূল কারণ।
**ভারতের মধ্যেই ভালো উদাহরণ — কোন রাজ্য এগিয়ে**
ভারতের সব জায়গায় পরিস্থিতি একই নয়। কিছু রাজ্য ও শহর নাগরিক সচেতনতার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো উদাহরণ তৈরি করেছে।
**১. কেরল**
কেরল দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যবিধি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে।
* স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থার শক্তিশালী ভূমিকা
* ঘরে ঘরে বর্জ্য আলাদা করার অভ্যাস
* উচ্চ সাক্ষরতার কারণে সচেতনতা বেশি
* কমিউনিটি অংশগ্রহণ বেশি
অনেক শহরে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে উদ্যোগ নেন।
**২. সিকিম**
সিকিমকে ভারতের অন্যতম পরিচ্ছন্ন রাজ্য হিসেবে ধরা হয়।
* প্লাস্টিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
* পর্যটন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কড়া নিয়ম
* পরিবেশ সচেতনতা স্কুল স্তর থেকেই শেখানো হয়
**৩. ইন্দোর (মধ্যপ্রদেশ) — শহর হিসেবে উদাহরণ**
ইন্দোর টানা কয়েক বছর ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে।
* বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহ
* কঠোর জরিমানা ব্যবস্থা
* নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
* প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ
**৪. মিজোরাম**
উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে সামাজিক নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বেশি।
* কমিউনিটি ভিত্তিক পরিষ্কার রাখার সংস্কৃতি
* সামাজিকভাবে নিয়ম ভাঙা নিরুৎসাহিত
**বিদেশের সঙ্গে তুলনা**
জাপান, সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে নাগরিক সচেতনতা অনেক বেশি দৃশ্যমান।
* কঠোর আইন ও জরিমানা
* ছোটবেলা থেকেই নাগরিক দায়িত্ব শেখানো
* পাবলিক স্পেসকে নিজের সম্পত্তির মতো দেখার সংস্কৃতি
জাপানে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই নিজের শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে, যা ছোট থেকেই দায়িত্ববোধ তৈরি করে। সিঙ্গাপুরে রাস্তা নোংরা করলে বড় অঙ্কের জরিমানা থাকায় আইন মানার প্রবণতা বেশি।
**সমস্যা কি শুধুই নাগরিকদের?**
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতাও দায়ী।
* পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব
* নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ না হওয়া
* নগর পরিকল্পনার ঘাটতি
এই দুই সমস্যার মিলিত ফলেই পরিস্থিতি জটিল হয়।
**সমাধানের পথ**
পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রয়োজন—
* কঠোর আইন প্রয়োগ
* উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
* স্কুল স্তরে নাগরিক শিক্ষা
* স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি
* নাগরিক ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ
**উপসংহার**
ভারতে নাগরিক সচেতনতার সমস্যা একদিকে যেমন বাস্তব, অন্যদিকে দেশের মধ্যেই ভালো উদাহরণ দেখায় যে পরিবর্তন সম্ভব। কেরল, সিকিম বা ইন্দোরের মতো উদাহরণ প্রমাণ করে—সঠিক নীতি, কঠোর বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকলে পরিষ্কার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ গড়া অসম্ভব নয়।